অর্থনীতি প্রতিবেদক, দৈনিক সংলাপ:
দীর্ঘ ২১ মাস ধরে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর অবশেষে পলিসি রেট বা নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রেপো রেট (Repo Rate) বা মূল নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী ২ আগস্ট থেকে এই নতুন পুনর্নির্ধারিত হার আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রেখেছিল। ব্যাংক খাতের নীতি সুদহার কমানোর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ কিছুটা কমবে। এতে করে বাজারে ঋণের সুদের হার ও টাকার তারল্য পরিস্থিতিতে এক ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়ার প্রত্যাশা করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী খাত।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নীতি সুদহার কমানোর এই উদ্যোগ ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থসংস্থান সহজ করার পাশাপাশি মন্দা ভাব কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে। তবে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি জোরদার রাখার ওপরও জোর দিচ্ছেন তারা।একই সাথে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) রেট ১১.৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, তবে স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) রেট ৭.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ওপর প্রভাব ও বর্তমান সুদের হার
বাণিজ্যিক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো জরুরি ভিত্তিতে বা স্বল্পমেয়াদে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ ধার নেওয়ার ক্ষেত্রে নীতি সুদহার নির্ধারিত হয়। গত প্রায় দুই বছর ধরে নীতি সুদহার ১০ শতাংশের উচ্চাসনে থাকায় সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে উচ্চ সুদে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হতো।
নীতি সুদহার কমানোর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের খরচ (Cost of Funds) কিছুটা কমবে। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ঋণের সাধারণ সুদের হার প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ এবং আমানতের সুদহার ৬ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের প্রভাবে রাষ্ট্রায়ত্তসহ সকল বাণিজ্যিক ব্যাংকের আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে অর্থের তারল্য কিছুটা সহজ হবে এবং পর্যায়ক্রমে ঋণের সুদের হার কিছুটা নেমে আসার সুযোগ তৈরি হবে।
সুদের হার যেভাবে নির্ধারিত হবে
‘স্মার্ট’ (SMART) ব্যবস্থা বিলুপ্তির পর ব্যাংকগুলো এখন থেকে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় গ্রাহক ও খাতের ঝুঁকি (Risk Premium) হিসাব করে সুদের হার নির্ধারণ করে আসছে। নীতি সুদহার কমার ফলে নতুন ঋণ ও আমানতের সুদের হার নিম্নরূপভাবে প্রভাবিত হতে পারে:
আমানতের সুদহার: ব্যাংকের ফান্ড কস্ট বা তহবিল ব্যয় কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি আমানতের সুদহার কিছুটা কমাতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতির হারের (বর্তমানে ৯ শতাংশের ওপরে) কারণে আমানতকারীদের আকৃষ্ট রাখতে বড় ধরনের কমানোর সম্ভাবনা কম।
ঋণের সুদহার: নতুন করে ইস্যু করা বা নবায়নযোগ্য শিল্প ঋণ, আমদানির চলতি মূলধন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ধীরে ধীরে কমে আসবে। বাণিজ্যিক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কর্পোরেট ও সিএমএসএমই খাতে কম খরচে ঋণ বিতরণের সুযোগ পাবে।
উৎপাদনশীল খাত প্রাধান্য: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো তাদের নির্ধারিত নীতি অনুসরণ করে বিশেষ করে কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল খাতে সর্বনিম্ন সুদহার বজায় রাখার সুযোগ পাবে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের পর্যালোচনা
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি খাতে ঋণের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে এই ছাড়কে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও একশ্রেণীর অর্থনীতিবিদ। তারা মনে করছেন, উচ্চ সুদহারের প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়েছিল, যার ফলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হয়। নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশে নামিয়ে আনায় বাজারে বিনিয়োগের পথ কিছুটা সুগম হবে।
তবে অপর একদল অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলছেন, মূল্যস্ফীতির হার এখনও ৯ শতাংশের উপরে অবস্থান করায় সুদহার তড়িঘড়ি কমালে বাজারের মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বাজারের তারল্য পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।
সার্বিকভাবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিনের উচ্চ সুদের চাপে থাকা দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।



