দৈনিক সংলাপ, প্রতিবেদক।
গারো পাহাড়ের সবুজ কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা সুসং দুর্গাপুরের এক প্রত্যন্ত ও অবহেলিত জনপদ নেত্রকোনার ঝাঞ্জাইল গ্রাম। প্রকৃতির অপার রূপ আর সাধারণ মানুষের অতিসাধারণ জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন মোঃ শহীদুল্লাহ খান (শহীদ খান)। তবে শৈশব থেকেই তার হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য, সুন্দর ও প্রগতির মশাল। অবহেলিত পলিমাটি থেকে উঠে এসে তিনি স্থান করে নিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং সাধারণ মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাকে ধারণ করে তিনি হয়ে উঠেছেন এক আলোকবর্তিকা।
নেত্রকোনার জারিয়া ঝাঞ্জাইল হাইস্কুল থেকে ১৯৭২ সালে এসএসসি ও গৌরিপুর কলেজ থেকে ১৯৭৬ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করার পর শহীদ খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইএসডব্লিউআর) থেকে সামাজিক বিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স (এমএসএস) ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে অবস্থানকালীন তিনি কার্টুন প্রদর্শনী থেকে শুরু করে আবৃত্তি, অভিনয়, উপস্থিত বক্তৃতা ও বিতর্কে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
কিন্তু অর্জিত জ্ঞানকে তিনি শুধু নিজের অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; ছড়িয়ে দিয়েছেন সমাজ ও সাধারণ মানুষের সেবায়। দীর্ঘ ২৫ বছর ময়মনসিংহ ফুলবাড়িয়া কলেজে সমাজকল্যাণ বিষয়ে অধ্যাপনা এবং পরবর্তীতে ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পূর্বধলা কলেজের প্রাজ্ঞ অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। শিক্ষাবিদ হিসেবে সুখ্যাতির পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রেও তার অবদান অনন্য। একক প্রচেষ্টায় ‘ঝাঞ্জাইল টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ’ প্রতিষ্ঠা, ‘ঝাঞ্জাইল হাই স্কুল’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
সংস্কৃতি অঙ্গনে অধ্যক্ষ শহীদ খানের বিচরণ এক কথায় মহীরুহের মতো। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে উপস্থাপনা, অভিনয় ও গ্রন্থনার মাধ্যমে জাতীয় পরিসরে তার আত্মপ্রকাশ। বিশেষ করে ‘নবকল্লোল’, ‘জন পরিক্রমা’ এবং আশির দশকের বিটিভির তুমুল জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘প্রকৃতি ও প্রত্যয়’-এর গ্রন্থনা ও উপস্থাপনা তাকে ঘরে ঘরে পরিচিত করে তোলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সারা দেশে মুকাভিনেতা হিসেবে তিনি যে ধারা সৃষ্টি করেছিলেন, তা তাকে বৃহত্তর ময়মনসিংহের ১ম মুকাভিনেতার মর্যাদা এনে দেয়।
নাটের মঞ্চে ও নেপথ্যে তিনি একাধারে নাট্যকার, নির্দেশক, সেট ডিজাইনার ও অভিনেতা। ১৯৭৪ সালের ‘ন্যায় ন্যায্য’ থেকে শুরু করে ‘অপারেশন কাকনপুর’, ‘ফুলবাড়িয়ার ফুলবানু’ কিংবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুসকে নিয়ে নির্মিত মাইলফলক নাটক ‘কোন এক কুদ্দুস’—তার কলমে ও নির্দেশনায় সামাজিক দায়বদ্ধতা বারবার ফুটে উঠেছে। ‘বহুরূপী’, ‘বহুবচন’, ‘নাট্যচক্র’, ‘যাত্রিক’-এর মতো প্রথম সারির নাট্য সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে তিনি নাট্যচর্চাকে পৌঁছে দিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষের কাছে।
শুধু সংস্কৃতি বা শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, সমাজ পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে সাধারণ মানুষের পাশে থাকার এক অদম্য তাগিদ তাকে সবসময় তাড়িত করেছে। ১৯৭২ সালে ‘ঝাঞ্জাইল মালঞ্চ সংসদ’ গঠনের মাধ্যমে এলাকার যুবসমাজকে দেশপ্রেম, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চায় উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করেছেন। এমন কি ময়মনসিংহের সানকিপাড়ায় রিকশাচালকদের সংগঠিত করে তাদের অধিকার ও কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি।
তার পিতা আব্দুস সাত্তার খান ছিলেন কাকৈরগড়া ইউনিয়নের পর পর দুইবারের সফল চেয়ারম্যান। পিতার আদর্শ, গণমানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নিজের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে এবার তিনি সরাসরি জনসেবায় আত্মনিয়োগ করতে চান। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে অবহেলিত সুসং দুর্গাপুর ও বৃহত্তর অঞ্চলের মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা, শিক্ষা-সংস্কৃতির বিস্তার এবং মেহনতী মানুষের ভাগ্যন্নয়নে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
গারো পাহাড়ের কোল থেকে শুরু হওয়া তার এই পথচলা আজ এক বিশাল অভিজ্ঞতার মহাসমুদ্র। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজসেবার এক অপূর্ব মেলবন্ধনে গড়া প্রজ্ঞাবান ও বিনয়ী এই মানুষটি অনাগত প্রজন্মের জন্য আলোর পথের দিশা। মেধা, সততা ও গণমানুষের ভালোবাসাকে সম্বল করে প্রার্থী হিসেবে শহীদ খানের এই নতুন যাত্রা এলাকার সর্বস্তরের মানুষের মাঝে জাগিয়ে তুলেছে এক নতুন আশার আলো।



