বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক সংলাপ:
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে প্রাকৃতিক গ্যাসের কোনো বিকল্প নেই। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি আমদানিতে যখন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে, তখন বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছিল দৃশ্যমানভাবে। সম্প্রতি বাসাবাড়ির গ্যাসের লাইন, সিএনজি পাম্প কিংবা শিল্পাঞ্চলে সংযোগ সংকটে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। তবে সেই সংকট কাটিয়ে সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে আবারও শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড।
গত বৃহস্পতি বার তিতাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, দেশের বিপুল পরিমাণ চাহিদার সাপেক্ষে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রতিষ্ঠানটি এখন পুরোদমে সচল। সার্বিক পরিস্থিতি ও তিতাসের বর্তমান অবস্থান নিয়ে দৈনিক সংলাপকে তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, কিছুদিন পূর্বে সংকটকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যতটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তিতাস বাস্তবতা মোকাবিলায় তার চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরছি।”
তিনি আরও জানান, সংযোগ সংস্কার, মেরামত বা কারিগরি কারণে কোথাও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে তা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও নিজস্ব প্রচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগেভাগেই গ্রাহকদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাসাবাড়ি কিংবা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া—সবক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিতে কাজ চলছে।
এ প্রসঙ্গে তিতাসের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো: আল-আমিন দৈনিক সংলাপকে বলেন, “সিস্টেম লস রোধ ও সরবরাহ নিশ্চিতকরণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পর আমরা আশাবাদী যে তিতাস অনেকটাই আগের অবস্থায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পূর্বের তুলনায় অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ, বকেয়া আদায় এবং আধুনিক মিটার স্থাপনের মাধ্যমে সিস্টেম লস ও ঘাটের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে।”
এদিকে সরকার ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাম্প্রতিক বিভিন্ন তথ্য ও পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি), যার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে প্রায় ২,৫০০ থেকে ২,৭০০ এমএমসিএফডি। এই ঘাটতি পূরণে এনার্জি রেগুলেশন বোর্ড ও তিতাস যৌথভাবে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এলএনজি (LNG) আমদানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান জোরদার করা, সিস্টেম লস শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা, শতভাগ প্রি-পেইড মিটার স্থাপন এবং অবৈধ পাইপলাইন উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের অপচয় বন্ধে যুগান্তকারী পদক্ষপে নেওয়া হচ্ছে।
সংকট উত্তরণের বাস্তব চিত্র দৃশ্যমান হচ্ছে মাঠ পর্যায়েও। গত কয়েকদিন আগেও যেখানে বাসাবাড়ির রান্নাবান্না কিংবা সিএনজি পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইন দেখা যেত, বর্তমানে তা অনেকটাই কমে স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে এসেছে। গ্যাসের তীব্র চাপে ইতিবাচক পরিবর্তন আসায় সচল হতে শুরু করেছে শিল্পাঞ্চলের বন্ধ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন কলকারখানা।
তৈরি পোশাক ও ভারী শিল্পমালিকরা জানান, বর্তমানে শিল্পাঞ্চলের গ্যাসের চাপ (Pressure) আগের চেয়ে অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উৎপাদন ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। মিল মালিক ও সিএনজি পাম্প কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেও একই আশাব্যঞ্জক চিত্র পাওয়া গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও দুর্নীতি প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে তিতাস এমডি বলেন, “তদারকি বাড়াতে তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক করা হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে বিন্দুমাত্র ছাড় না দিয়ে তাৎক্ষণিক আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।” দেশের অগ্রযাত্রায় তিতাসের ভূমিকা অব্যাহত রাখতে সরকারের সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করায় প্রধানমন্ত্রী ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানান তিনি।
সরকারি সুচিন্তিত নীতিমালা, বিইআরসির নির্দেশনা এবং তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রমের যৌথ প্রয়াসে গ্যাস খাতে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কেটে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হচ্ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
তিতাসের সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা: শিল্প ও বাসাবাড়িতে স্বস্তি, জোরালো তিতাসের মহাপরিকল্পনা
Date:



